একই ঘরে পাশাপাশি বসে আছেন কয়েকজন। কিন্তু মশার কামড় খেতে হচ্ছে একজনকেই বেশি, অন্যদের তেমন সমস্যা হচ্ছে না। এমন অভিজ্ঞতার পেছনে রয়েছে মানুষের শরীরের গন্ধ, ত্বকের রাসায়নিক উপাদান, নিশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং মশার সংবেদনশীলতার মতো কয়েকটি কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষের শরীরের গন্ধ মশাকে অন্যদের তুলনায় বেশি আকর্ষণ করতে পারে। তবে শুধু রক্তের গ্রুপ দিয়ে মশার পছন্দ ব্যাখ্যা করা যায় না।
১. ত্বকের রাসায়নিক উপাদান
কিছু মানুষকে মশা বেশি আকর্ষণ করার অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হলো তাঁদের ত্বক থেকে নির্গত রাসায়নিক উপাদান। ২০২২ সালে Cell সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যাঁদের প্রতি এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির মশার আকর্ষণ বেশি, তাঁদের ত্বক থেকে নির্গত গন্ধে কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল। এডিস ইজিপ্টি মশা ডেঙ্গু, জিকা ও হলুদ জ্বরের মতো রোগের ভাইরাস ছড়াতে পারে।
গবেষণাটিতে ৬৪ জন স্বেচ্ছাসেবীর ত্বকের গন্ধ পরীক্ষা করা হয়। তাঁদের মধ্যে কারও কারও প্রতি মশার আকর্ষণ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। গবেষকেরা আরও দেখেন, এই পার্থক্য কয়েক বছর ধরেও স্থায়ী থাকতে পারে।
ত্বকের গন্ধ তৈরিতে ত্বকের নিজস্ব নিঃসরণ এবং সেখানে বসবাসকারী অণুজীবের ভূমিকা রয়েছে। এসব উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি গন্ধ মশার কাছে কাউকে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। তবে কার্বক্সিলিক অ্যাসিডই একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই।
২. নিশ্বাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড
মানুষ নিশ্বাস ছাড়ার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। মশা তার বিশেষ সংবেদনশীল অঙ্গের সাহায্যে বাতাসে থাকা এই গ্যাস শনাক্ত করতে পারে। এর মাধ্যমে আশপাশে মানুষ বা অন্য কোনো সম্ভাব্য রক্তের উৎস থাকার বিষয়ে ধারণা পায়।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, মশার অ্যান্টেনা কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং বাতাসের চলাচল শনাক্ত করতে পারে। কাছে আসার পর মশা গন্ধসহ অন্যান্য সংকেত ব্যবহার করে সম্ভাব্য শিকার খুঁজে নেয়। <Cite refs={[“turn194529search7”]}/>
শরীরের আকার, শারীরিক কার্যকলাপ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরন অনুযায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনে পার্থক্য হতে পারে। তবে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেশি নির্গত হলেই কোনো ব্যক্তিকে সব পরিস্থিতিতে বেশি মশা কামড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মশার আকর্ষণ নির্ধারণে আরও কিছু সংকেত একসঙ্গে কাজ করে।
৩. রক্তের গ্রুপ কি দায়ী?
মশার কামড়ের সঙ্গে রক্তের গ্রুপের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০০৪ সালে Journal of Medical Entomology সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির মশার মানুষের ত্বকে বসার প্রবণতা পরীক্ষা করা হয়।
৬৪টি মানব-পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ‘ও’ রক্তের গ্রুপের মানুষের প্রতি মশার আকর্ষণ ‘এ’ গ্রুপের মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। তবে এই ফলাফল থেকে বলা যায় না যে সব ধরনের মশা ‘ও’ গ্রুপের মানুষকেই বেশি কামড়ায়। গবেষণাটি নির্দিষ্ট প্রজাতি ও পরীক্ষার পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। <Cite refs={[“turn194529search8″,”turn194529search11”]}/>
অর্থাৎ, রক্তের গ্রুপের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা থাকলেও এটি একমাত্র বা চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। শরীরের গন্ধ ও অন্যান্য সংকেতও মশার পছন্দে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৪. শরীরের তাপমাত্রা ও অন্যান্য সংকেত
মশা মানুষের কাছে পৌঁছানোর পর শুধু গন্ধের ওপর নির্ভর করে না। শরীরের তাপমাত্রা, ত্বকের কাছাকাছি বাতাসের বৈশিষ্ট্য এবং অন্যান্য পরিবেশগত সংকেতও মশাকে সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
কেউ ব্যায়াম করে ঘেমে গেলে, গরম পরিবেশে থাকলে বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকলে তাঁর শরীর থেকে নির্গত গন্ধ ও তাপের ধরন বদলাতে পারে। এসব পরিবর্তন মশার কাছে তাঁর আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে বেশি মশা কামড়ানোর পেছনে কোন সংকেত কতটা দায়ী, তা পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
মশার কামড়ে বড় ফোলা মানেই কি বেশি কামড়?
মশা কামড়ানোর পর কারও ত্বকে ছোট লাল দাগ হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে বড় ফোলা ও তীব্র চুলকানি দেখা দেয়। এ পার্থক্য শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
মশা কামড়ানোর সময় ত্বকে লালা প্রবেশ করে। এর বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা প্রতিক্রিয়া দেখালে চুলকানি, লালচে ভাব ও ফোলা হতে পারে। কারও প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক বেশি, আবার কারও কম হয়। তাই বড় ফোলা দেখেই বলা যায় না যে তাঁকে অন্যদের তুলনায় বেশি বার কামড়ানো হয়েছে।
মশার কামড় থেকে বাঁচতে কী করবেন?
মশা কাকে বেশি আকর্ষণ করে, তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও কামড়ের ঝুঁকি কমানো যায়।
- বাইরে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন।
- হাত-পা ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরুন।
- ঘরের জানালা ও দরজায় মশারির জাল বা উপযুক্ত নেট ব্যবহার করুন।
- ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন।
- বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে মশার বংশবিস্তার কমান।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি থাকায় শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়, বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, কিছু মানুষকে মশা বেশি কামড়ানোর পেছনে ত্বকের গন্ধ, কার্বন ডাই-অক্সাইড, শরীরের অন্যান্য সংকেত এবং সম্ভাব্যভাবে রক্তের গ্রুপের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে কোনো একক কারণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না। গবেষকেরা এখনো খুঁজে দেখছেন, মানুষের শরীরের কোন বৈশিষ্ট্য মশার আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি নির্ধারণ করে।
সুত্রঃ প্রথম আলো










