মোবাইল ফোন এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। কথা বলা, ইন্টারনেট ব্যবহার কিংবা কাজের প্রয়োজনে বেশির ভাগ মানুষই দীর্ঘ সময় ফোন সঙ্গে রাখেন। অনেকেই প্যান্টের সামনের পকেটে ফোন রাখেন। কিন্তু এ অভ্যাস পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা, গুণমান ও প্রজননক্ষমতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।
বিভিন্ন গবেষণায় মোবাইল ফোন থেকে নির্গত রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের (RF-EMF) সম্ভাব্য প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রমাণ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে পকেটে মোবাইল ফোন রাখলেই শুক্রাণুর ক্ষতি হয় কিংবা বন্ধ্যত্ব দেখা দেয়।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
২০২৪ সালে Environment International সাময়িকীতে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে করা একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় মোবাইল ফোনের ব্যবহার ও পুরুষের প্রজননক্ষমতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষকেরা শুক্রাণুর ঘনত্ব, মোট সংখ্যা, আকৃতি ও গতিশীলতার মতো বিষয় বিবেচনা করেন। পর্যালোচনায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে এসব সূচকের সম্পর্কের বিষয়ে প্রমাণের নিশ্চয়তা খুব কম বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ, মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে শুক্রাণুর গুণমান কমে যায়—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় এবং ফোন শরীরের কোথায় রাখা হচ্ছে—দুটি বিষয় এক নয়। কেউ দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার করলেও সেটি পকেটে না রাখতে পারেন। আবার কেউ কম ব্যবহার করলেও দীর্ঘ সময় পকেটে রাখতে পারেন। তাই শুধু ব্যবহারের সময়ের তথ্য দিয়ে পকেটে ফোন রাখার নির্দিষ্ট প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।
মোবাইলের বিকিরণ কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?
মোবাইল ফোন যোগাযোগের জন্য রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণ ব্যবহার করে। এটি আয়নাইজিং বিকিরণ নয়; অর্থাৎ এক্স-রে বা গামা রশ্মির মতো সরাসরি পরমাণু থেকে ইলেকট্রন সরিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি এর নেই।
তবে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণ শুক্রাণুর ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে শুক্রাণুর চলাচলের ক্ষমতা, কোষের কার্যকারিতা ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মতো বিষয় পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পরীক্ষাগারের গবেষণা কী বলছে?
২০২৪ সালে প্রকাশিত আরেকটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় প্রাণী এবং পরীক্ষাগারে মানবশুক্রাণুর ওপর রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে কিছু পরীক্ষায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে প্রমাণের নিশ্চয়তা ছিল খুব কম।
পরীক্ষাগারের পরিবেশে বিকিরণের মাত্রা, সময়কাল ও অন্যান্য পরিস্থিতি বাস্তব জীবনের ব্যবহারের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এ কারণে পরীক্ষাগারে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলেই পকেটে ফোন রাখলে মানুষের শুক্রাণুর ক্ষতি হবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
পকেটে মোবাইল রাখার বিষয়ে কী সতর্কতা নেওয়া যায়?
মোবাইল ফোনের কারণে শুক্রাণুর ক্ষতি হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ না থাকলেও অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ সময় শরীরের সঙ্গে ফোন লাগিয়ে না রাখার মতো সাধারণ সতর্কতা নেওয়া যেতে পারে। যেমন—
-
দীর্ঘ সময় ফোন প্যান্টের সামনের পকেটে না রেখে ব্যাগে রাখা যেতে পারে।
-
ফোন চার্জ দেওয়ার সময় শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে না রাখা ভালো।
-
ফোন অতিরিক্ত গরম হলে পকেটে না রাখা উচিত।
-
ফোনের প্রস্তুতকারকের নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করা যেতে পারে।
তবে এসব পদক্ষেপকে বন্ধ্যত্ব প্রতিরোধের প্রমাণিত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। ফোন শরীর থেকে দূরে রাখলে নির্দিষ্ট পরিমাণে ঝুঁকি কমে—এমন দাবি করার জন্যও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রমাণ প্রয়োজন।
শুক্রাণুর স্বাস্থ্যে অন্য কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ?
শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান শুধু মোবাইল ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে না। বয়স, ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, স্থূলতা, কিছু ওষুধ, হরমোনজনিত সমস্যা, সংক্রমণ এবং অণ্ডকোষের অতিরিক্ত তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন বিষয় প্রজননক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই সন্তান নিতে সমস্যা হলে শুধু মোবাইল ফোনকে দায়ী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে চিকিৎসক বীর্য পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
তাহলে কি মোবাইল ফোন পকেটে রাখা বন্ধ করতে হবে?
বর্তমান গবেষণার ভিত্তিতে সবার জন্য পকেটে মোবাইল রাখা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। একই সঙ্গে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা পুরোপুরি শেষ হয়েছে, এমনটিও বলা যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মোবাইল ফোন পকেটে রাখার সঙ্গে শুক্রাণুর ক্ষতির সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়। গবেষণায় পাওয়া অনিশ্চিত ফলাফলকে নিশ্চিত স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে প্রচার করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ভবিষ্যতের গবেষণায় নতুন তথ্য আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সূত্র: যুগান্তর








