মোবাইল ফোনে ৪জি বা এলটিই নেটওয়ার্ক দেখাচ্ছে, কিন্তু ইন্টারনেট চলছে ধীরগতিতে। ওয়েবসাইট খুলতে সময় লাগছে, ভিডিও বারবার আটকে যাচ্ছে কিংবা প্রয়োজনীয় ফাইল ডাউনলোড করতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে—এমন সমস্যায় অনেক ব্যবহারকারী পড়েন। বিশেষ করে মোবাইল ডেটা ব্যবহার করার সময় এ ধরনের সমস্যা হলে বিরক্তির শেষ থাকে না।
আরও পড়ুন-চার্জিংয়ের সময় যে ৪ ভুলে নষ্ট হতে পারে ফোনের ইউএসবি পোর্ট
অনেকেই মনে করেন, ফোনে পূর্ণ ৪জি সিগন্যাল থাকলে ইন্টারনেটের গতিও ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ, দুর্বল সিগন্যালের মান, ডেটা প্যাকেজের সীমা শেষ হয়ে যাওয়া, ফোনের সেটিংস কিংবা ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা অ্যাপের কারণে ইন্টারনেট ধীর হতে পারে।
তবে কিছু বিষয় নিজে পরীক্ষা করেই সমস্যার কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। মোবাইলে ৪জি থাকা সত্ত্বেও ইন্টারনেট ধীর হলে গতি ও সংযোগের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে নিচের পাঁচটি কৌশল অনুসরণ করতে পারেন।
১. এপিএন (APN) সেটিংস সঠিক আছে কি না দেখুন
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে APN বা Access Point Name গুরুত্বপূর্ণ একটি সেটিংস। এটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ফোনকে ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত হতে সাহায্য করে। এপিএন সেটিংসে ভুল তথ্য থাকলে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন বা ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সাধারণত Settings থেকে Mobile Network বা Connections বিভাগে গিয়ে Access Point Names অপশন পাওয়া যায়। সেখানে আপনার ব্যবহৃত সিমের জন্য নির্ধারিত এপিএন নির্বাচন করা আছে কি না, তা পরীক্ষা করুন।
বাংলাদেশের কয়েকটি অপারেটরের প্রচলিত ইন্টারনেট এপিএন হলো—
– গ্রামীণফোন: এপিএন নাম GP-INTERNET, এপিএন gpinternet
– রবি ও এয়ারটেল: এপিএন নাম Robi-INTERNET, এপিএন internet
– বাংলালিংক: এপিএন নাম Banglalink Internet, এপিএন blinternet
– টেলিটক: এপিএন নাম Teletalk Internet, এপিএন teletalk
তবে এগুলোকে সব সিম ও ডিভাইসের জন্য চূড়ান্ত বা সর্বশেষ সেটিংস ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অপারেটরভেদে সেটিংস পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এপিএন পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের গ্রাহকসেবা বা অফিসিয়াল নির্দেশনা থেকে তথ্য নিশ্চিত করুন।
এপিএন পরিবর্তন করার প্রয়োজন হলে সঠিক তথ্য দিয়ে সেটিংস সংরক্ষণ করুন। এরপর নতুন এপিএন নির্বাচন করে মোবাইল ডেটা বন্ধ ও চালু করুন। প্রয়োজন হলে ফোন রিস্টার্ট দিয়ে ইন্টারনেট পরীক্ষা করুন। অকারণে এপিএন পরিবর্তন করবেন না, কারণ ভুল সেটিংস দিলে সংযোগ আরও সমস্যায় পড়তে পারে।
২. নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ আছে কি না বুঝে নিন
মোবাইল ইন্টারনেটের গতি সব সময় একই থাকে না। একটি নির্দিষ্ট এলাকার একই মোবাইল টাওয়ার থেকে অনেক ব্যবহারকারী একসঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহার করলে নেটওয়ার্কে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময় বা জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ কারণে ফোনে ৪জি সিগন্যাল দেখা গেলেও ওয়েবসাইট খুলতে দেরি হতে পারে, ভিডিওর মান কমে যেতে পারে কিংবা ডাউনলোডের গতি কমে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করতে পারেন। প্রথমে কিছুক্ষণ পর আবার ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেখুন। সম্ভব হলে দিনের অন্য সময়ে একই জায়গায় গতি পরীক্ষা করুন। বড় ফাইল ডাউনলোড বা অনলাইন ভিডিও দেখার ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে নির্ভরযোগ্য ওয়াই-ফাই সংযোগ ব্যবহার করতে পারেন।
একই জায়গায় অন্য ব্যবহারকারীর ফোনে একই অপারেটরের ইন্টারনেটের গতি কেমন, সেটিও তুলনা করে দেখতে পারেন। তবে শুধু সন্ধ্যায় বা রাতে ইন্টারনেট ধীর হলেই নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। অপারেটরের নেটওয়ার্ক সমস্যা বা অন্য কারণও থাকতে পারে।
৩. ফোনে ৪জি বা এলটিই নেটওয়ার্ক নির্বাচন করুন
ফোনের নেটওয়ার্ক সেটিংসে ভুল করে ৩জি বা অন্য কোনো নেটওয়ার্ক মোড নির্বাচন করা থাকলে ৪জি সুবিধা পাওয়া নাও যেতে পারে। তাই ফোনে ৪জি সেবা ব্যবহারের সুযোগ থাকলে নেটওয়ার্ক মোড পরীক্ষা করা জরুরি।
এ জন্য ফোনের Settings অপশনে যান। এরপর Mobile Network, SIM Card বা Connections বিভাগ থেকে Preferred Network Type বা Network Mode খুঁজে বের করুন। সেখানে 4G/LTE অথবা 5G/4G/3G/2G Auto-এর মতো বিকল্প থাকলে আপনার ডিভাইস ও অপারেটরের উপযোগী বিকল্প নির্বাচন করুন।
তবে শুধু ৪জি নির্বাচন করলেই উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত হবে না। এর জন্য ফোনে ৪জি সমর্থন, উপযুক্ত সিম, সক্রিয় ডেটা প্যাকেজ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় অপারেটরের ৪জি নেটওয়ার্ক থাকা প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, কিছু ফোনে নেটওয়ার্ক মোডের নাম বা সেটিংসের অবস্থান আলাদা হতে পারে। তাই নিজের ফোনের মডেল অনুযায়ী সেটিংস পরীক্ষা করুন।
৪. দুর্বল সিগন্যালের জায়গা পরিবর্তন করুন
মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে দুর্বল নেটওয়ার্ক সিগন্যাল। ঘরের ভেতরে, বেসমেন্টে, লিফটের কাছে কিংবা উঁচু ভবনের এমন জায়গায় যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক ঠিকমতো পৌঁছায় না, সেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারে সমস্যা হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ঘরের জানালার কাছে বা খোলা জায়গায় গিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেখুন। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে বারবার সিগন্যালের পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেটিও লক্ষ করুন।
ফোনে মোটা বা ধাতব কেস ব্যবহার করলে সেটি খুলে সাময়িকভাবে পরীক্ষা করতে পারেন। তবে সব ধরনের ফোন কেস নেটওয়ার্কে সমস্যা তৈরি করে না। তাই এটিকে নিশ্চিত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
একই জায়গায় বারবার নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকলে অপারেটরের কভারেজসংক্রান্ত সমস্যা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে আপনার এলাকার নেটওয়ার্ক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন।
৫. ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা ও সফটওয়্যার সেটিংস পরীক্ষা করুন
ফোনে কোনো অ্যাপ ব্যবহার না করলেও কিছু অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপ, ক্লাউড ব্যাকআপ, স্বয়ংক্রিয় অ্যাপ আপডেট এবং ফাইল সিঙ্ক করার মতো কাজের কারণে মোবাইল ডেটা খরচ হতে পারে।
ফলে আপনার অজান্তেই ডেটা প্যাকেজের পরিমাণ কমে যেতে পারে। আবার একই সময়ে একাধিক অ্যাপ ইন্টারনেট ব্যবহার করলে সক্রিয় কাজের গতি কম মনে হতে পারে।
এ সমস্যা কমাতে ফোনের Settings থেকে Data Usage বা Mobile Data Usage বিভাগে যান। সেখানে কোন অ্যাপ কতটুকু ডেটা ব্যবহার করছে, তা পরীক্ষা করুন। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা সীমিত করতে পারেন।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও অটোপ্লে বন্ধ রাখুন এবং অ্যাপের স্বয়ংক্রিয় আপডেটের সেটিংস পরীক্ষা করুন। প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ডেটা ব্যবহার করে বড় ফাইল ডাউনলোড বা ক্লাউড ব্যাকআপ চালু রাখবেন না।
ফোনের অপারেটিং সিস্টেম ও প্রয়োজনীয় অ্যাপ হালনাগাদ আছে কি না, সেটিও দেখুন। তবে আপডেটের সময় মোবাইল ডেটার পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য ওয়াই-ফাই ব্যবহার করা ভালো।
ইন্টারনেটের গতি না বাড়লে যা করবেন
উপরের পাঁচটি কৌশল অনুসরণ করার পরও ইন্টারনেটের গতি স্বাভাবিক না হলে সমস্যাটি শুধু ফোনের সেটিংসে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি।
প্রথমত, আপনার ডেটা প্যাকেজের নির্ধারিত পরিমাণ শেষ হয়েছে কি না দেখুন। কিছু প্যাকেজে নির্দিষ্ট ডেটা ব্যবহারের পর গতি সীমিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সিমটি ৪জি সেবা সমর্থন করে কি না এবং ফোনে সঠিক সিম থেকে মোবাইল ডেটা চালু রয়েছে কি না পরীক্ষা করুন।
একই সিম অন্য একটি ৪জি সমর্থিত ফোনে ব্যবহার করে দেখলে সমস্যাটি ফোনে, নাকি সিম বা নেটওয়ার্কে—সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে অপারেটরের গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে এলাকার নেটওয়ার্ক কভারেজ, ডেটা প্যাকেজ ও সিমের অবস্থা যাচাই করুন।
পূর্ণ ৪জি সিগন্যাল থাকলেই কি দ্রুত ইন্টারনেট পাওয়া যায়?
না। ফোনে ৪জি বা পূর্ণ সিগন্যাল দেখা মানেই দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত নয়। সিগন্যালের শক্তি, নেটওয়ার্কের সক্ষমতা, একই টাওয়ারে যুক্ত ব্যবহারকারীর সংখ্যা, ফোনের হার্ডওয়্যার এবং অপারেটরের ডেটা সেবার মান—সবকিছুই ইন্টারনেটের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই ইন্টারনেট ধীর হলে প্রথমেই ফোনের নেটওয়ার্ক মোড, এপিএন, ডেটা প্যাকেজ এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা অ্যাপ পরীক্ষা করুন। সমস্যা নির্দিষ্ট এলাকায় হলে অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। কারণ, সব সমস্যার সমাধান শুধু ফোনের সেটিংস পরিবর্তন করে সম্ভব নয়।
সূত্র: যুগান্তর নিউজ







