গরমের দিনে স্বস্তি পেতে অনেকেই বাসা, অফিস কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এয়ার কন্ডিশনার বা এসি ব্যবহার করেন। কিন্তু এসি কেনার পর নিয়মিত পরিষ্কার ও সার্ভিস করানোর বিষয়টি অনেকেই গুরুত্ব দেন না। ফলে কিছুদিন পর দেখা যায়, আগের মতো ঠান্ডা হচ্ছে না, বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাচ্ছে, পানি পড়ছে কিংবা এসি থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।
এসব সমস্যা এড়াতে নির্দিষ্ট সময় পরপর এসি পরিষ্কার ও সার্ভিস করানো জরুরি। তবে প্রশ্ন হলো, এসি কতদিন পরপর সার্ভিস করতে হয়? প্রতি মাসে কি টেকনিশিয়ান দিয়ে সার্ভিস করাতে হবে, নাকি বছরে একবার করালেই যথেষ্ট?
আরও পড়ুন- বজ্রপাতের সময় এসি চালালে হতে পারে ভয়ংকর দুর্ঘটনা
সাধারণভাবে, এসি ব্যবহারের ধরন ও পরিবেশ অনুযায়ী প্রতি ৬ মাস থেকে ১ বছর অন্তর পেশাদার সার্ভিস করানো ভালো। তবে ধুলাবালু বেশি এমন এলাকায় বা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় এসি চালালে আরও ঘন ঘন পরীক্ষা ও পরিষ্কারের প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে, এসির এয়ার ফিল্টার ব্যবহারকারী নিজেই সাধারণত প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর পরিষ্কার করতে পারেন। মডেলভেদে সময়সূচি আলাদা হতে পারে, তাই প্রস্তুতকারকের নির্দেশনাও অনুসরণ করা উচিত।
এসি কতদিন পরপর সার্ভিস করাতে হবে?
সব এসির জন্য একই সময়সূচি প্রযোজ্য নয়। এসি কতক্ষণ চালানো হয়, ঘরে ধুলাবালু কতটা প্রবেশ করে, পরিবেশ কতটা আর্দ্র এবং এসির ধরন কী—এসব বিষয়ের ওপর সার্ভিসের সময় নির্ভর করে।
ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী একটি সাধারণ ধারণা নিচে দেওয়া হলো:
-
নিয়মিত ব্যবহার: প্রতি ৬ মাস অন্তর পেশাদার সার্ভিস করানো যেতে পারে।
-
প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ব্যবহার: প্রতি ৩ থেকে ৬ মাস অন্তর পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরিষ্কার করানো ভালো।
-
মাঝেমধ্যে ব্যবহার: বছরে অন্তত একবার পেশাদার পরীক্ষা করানো উচিত।
-
ধুলাবালু বেশি এমন পরিবেশ: ফিল্টার ঘন ঘন পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টেকনিশিয়ান দিয়ে ভেতরের অংশ পরীক্ষা করাতে হবে।
এগুলো সাধারণ পরামর্শ। আপনার এসির মডেল, প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা ও ওয়ারেন্টির শর্ত অনুযায়ী সময়সূচি ঠিক করা ভালো।
এসির কোন অংশ কতদিন পরপর পরিষ্কার করবেন?
এসি ভালো রাখতে শুধু বাইরের অংশ মুছে রাখলেই হয় না। এর ভেতরের কয়েকটি অংশে ধুলা জমে গেলে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং শীতল করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
১. এয়ার ফিল্টার
এসি চালানোর সময় বাতাসের সঙ্গে ধুলাবালু ফিল্টারে জমা হয়। ফিল্টার বেশি ময়লা হলে বাতাস চলাচল কমে যায় এবং ঘর ঠান্ডা করতে বেশি সময় লাগে।
-
সাধারণভাবে প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর ফিল্টার পরীক্ষা ও পরিষ্কার করুন।
-
ধুলাবালু বেশি থাকলে আরও ঘন ঘন পরিষ্কার করুন।
-
পরিষ্কারের পর ফিল্টার সম্পূর্ণ শুকিয়ে পুনরায় লাগান।
-
ফিল্টার পরিষ্কারের নিয়ম জানতে এসির ব্যবহারবিধি অনুসরণ করুন।
২. ইনডোর ইউনিটের কয়েল
ইনডোর ইউনিটের ভেতরে থাকা কয়েলে ধুলা ও ময়লা জমতে পারে। এতে বাতাসের প্রবাহ এবং তাপ বিনিময়ের কার্যকারিতা কমে যায়। সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে এই অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার করা কঠিন। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ টেকনিশিয়ানের সাহায্য নেওয়া উচিত।
৩. আউটডোর ইউনিট
আউটডোর ইউনিট সাধারণত বাইরে থাকে বলে এতে ধুলাবালু, পাতা ও অন্যান্য ময়লা জমতে পারে। এর ফলে তাপ বের হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। সার্ভিসের সময় টেকনিশিয়ানকে আউটডোর ইউনিটের কয়েল, ফ্যান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরীক্ষা করতে বলুন।
৪. ড্রেন পাইপ
এসি চালানোর সময় তৈরি হওয়া পানি ড্রেন পাইপ দিয়ে বাইরে বের হয়। পাইপে ময়লা জমে আটকে গেলে ইনডোর ইউনিট থেকে পানি পড়তে পারে। তাই নিয়মিত সার্ভিসের সময় ড্রেন লাইন পরীক্ষা ও পরিষ্কার করা জরুরি।
৫. ফ্যান ও বৈদ্যুতিক সংযোগ
ইনডোর ও আউটডোর ইউনিটের ফ্যান ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, বৈদ্যুতিক সংযোগে সমস্যা আছে কি না এবং অস্বাভাবিক শব্দ হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও সার্ভিসের সময় পরীক্ষা করা উচিত।
এসি সার্ভিস না করালে কী কী সমস্যা হতে পারে?
নির্দিষ্ট সময় পরপর এসি পরিষ্কার ও পরীক্ষা না করালে ছোট সমস্যা ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করতে পারে। যেমন—
১. ঘর ঠান্ডা হতে বেশি সময় লাগা: ফিল্টার বা কয়েলে ময়লা জমলে বাতাস চলাচল ও তাপ বিনিময় বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে এসি চালানোর পরও ঘর ঠান্ডা হতে বেশি সময় লাগে।
২. বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়া: এসি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না পারলে একই মাত্রার শীতলতা পেতে বেশি সময় চলতে পারে। এতে বিদ্যুৎ খরচ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
৩. পানি পড়া: ড্রেন পাইপ আটকে গেলে এসির ভেতর থেকে পানি পড়তে পারে। সময়মতো পরিষ্কার না করলে দেয়াল, আসবাব কিংবা মেঝেতে ক্ষতি হতে পারে।
৪. দুর্গন্ধ তৈরি হওয়া: এসির ভেতরে আর্দ্রতা ও ময়লা জমে থাকলে দুর্গন্ধ হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছত্রাক বা জীবাণুর বৃদ্ধিও ঘটতে পারে।
৫. যন্ত্রাংশের ওপর চাপ তৈরি হওয়া: বাতাস চলাচলে বাধা বা অন্য কোনো যান্ত্রিক সমস্যা থাকলে এসির বিভিন্ন অংশের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। এতে মেরামতের খরচ বাড়তে পারে।
কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত এসি সার্ভিস করাবেন?
নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষা না করে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত এসি পরীক্ষা করানো উচিত।
-
এসি চালানোর পরও ঘর আগের মতো ঠান্ডা হচ্ছে না।
-
ইনডোর ইউনিট থেকে পানি পড়ছে।
-
এসি থেকে অস্বাভাবিক শব্দ হচ্ছে।
-
চালু করার পর পোড়া গন্ধ বা অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।
-
বাতাসের প্রবাহ আগের তুলনায় কমে গেছে।
-
এসি বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা এরর কোড দেখাচ্ছে।
-
বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
বিশেষ করে পোড়া গন্ধ, বৈদ্যুতিক স্পার্ক বা অস্বাভাবিক গরম হওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে এসি বন্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন এবং দক্ষ টেকনিশিয়ানের সাহায্য নিন।
এসির সার্ভিসের সময় টেকনিশিয়ানকে কী কী পরীক্ষা করতে বলবেন?
অনেক সময় সার্ভিসের নামে শুধু ফিল্টার বা বাইরের অংশ পরিষ্কার করে দেওয়া হয়। কিন্তু ভালো সার্ভিসে এসির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোও পরীক্ষা করা দরকার।
সার্ভিসের সময় নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে পারেন:
১। ইনডোর ইউনিটের ফিল্টার ও কয়েল পরিষ্কার করা।
২। আউটডোর ইউনিটের কয়েল ও ফ্যান পরীক্ষা করা।
৩। ড্রেন পাইপে পানি চলাচল স্বাভাবিক আছে কি না দেখা।
৪। বৈদ্যুতিক সংযোগ ও তার পরীক্ষা করা।
৫। থার্মোস্ট্যাট ও রিমোটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা।
৬। অস্বাভাবিক শব্দ বা কম্পনের কারণ খুঁজে দেখা।
৭। কুলিং কমে গেলে রেফ্রিজারেন্ট লিক আছে কি না পরীক্ষা করা।
৮। সার্ভিস শেষে এসি চালিয়ে কুলিং ও অন্যান্য কার্যক্রম পরীক্ষা করা।
এসির গ্যাস কি প্রতিবছর পরিবর্তন করতে হয়?
এসি ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, প্রতিবছর এসির গ্যাস পরিবর্তন বা রিফিল করতে হয়। কিন্তু এটি সঠিক নয়। সাধারণভাবে এসির রেফ্রিজারেন্ট একটি বন্ধ ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে। সিস্টেমে লিক না থাকলে শুধু নির্দিষ্ট সময় পার হয়েছে বলে গ্যাস পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না।
এসি ঠান্ডা কম করলে প্রথমেই গ্যাস কমে গেছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ফিল্টার ময়লা, কয়েলে ধুলা জমা, ফ্যানের সমস্যা বা অন্য যান্ত্রিক ত্রুটিও এর কারণ হতে পারে। তাই গ্যাস দেওয়ার আগে টেকনিশিয়ানকে লিক পরীক্ষা ও সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে বলুন। লিক থাকলে সেটি মেরামত করে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক পরিমাণ রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করা উচিত।
নিজে এসি পরিষ্কার করবেন, নাকি টেকনিশিয়ান ডাকবেন?
এসির কিছু সাধারণ পরিষ্কারের কাজ নিজেই করা যায়। তবে সব কাজ নিজে করার চেষ্টা করা নিরাপদ নয়।
নিজে যেসব কাজ করতে পারেন:
-
ব্যবহারবিধি অনুযায়ী এয়ার ফিল্টার খুলে পরিষ্কার করা।
-
ইনডোর ইউনিটের বাইরের অংশ শুকনো বা সামান্য ভেজা নরম কাপড় দিয়ে মোছা।
-
আউটডোর ইউনিটের চারপাশে জমে থাকা পাতা ও আবর্জনা সরানো।
-
এসির বাতাস চলাচলের পথ বাধামুক্ত রাখা।
টেকনিশিয়ানের সাহায্য নেবেন যেসব কাজে:
-
ইনডোর ও আউটডোর ইউনিটের গভীর পরিষ্কার।
-
কয়েল ও ড্রেন লাইন পরিষ্কার করা।
-
বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা ও মেরামত।
-
রেফ্রিজারেন্ট লিক শনাক্ত ও মেরামত।
-
ফ্যান, মোটর, কম্প্রেসর বা সার্কিট বোর্ডের সমস্যা সমাধান।
পরিষ্কারের আগে অবশ্যই এসির বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করুন। বৈদ্যুতিক অংশে পানি ব্যবহার করবেন না। নিজে এসি খুলে গভীর পরিষ্কার করার চেষ্টা করলে যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়া বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এসি ভালো রাখতে প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস
নিয়মিত সার্ভিসের পাশাপাশি কিছু সাধারণ অভ্যাস এসির কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
-
এসি চালানোর সময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখুন।
-
ঘরের জানালায় পর্দা ব্যবহার করুন, যাতে সরাসরি রোদ কম প্রবেশ করে।
-
এসির ইনডোর ও আউটডোর ইউনিটের বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ করবেন না।
-
দীর্ঘ সময় এসি চালানোর পর ফিল্টার পরীক্ষা করুন।
-
রিমোটে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা নির্ধারণ না করে আরামদায়ক তাপমাত্রা ব্যবহার করুন।
-
এসি থেকে অস্বাভাবিক শব্দ বা পানি পড়লে অবহেলা করবেন না।
-
এসির মডেল অনুযায়ী প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
শেষ কথা
এসি কতদিন পরপর সার্ভিস করাতে হবে, তা নির্ভর করে ব্যবহারের ধরন, পরিবেশ ও যন্ত্রের অবস্থার ওপর। সাধারণভাবে প্রতি ৬ মাস অন্তর পেশাদার সার্ভিস করানো ভালো অভ্যাস। তবে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় এসি চালালে বা ধুলাবালু বেশি থাকলে আরও ঘন ঘন পরীক্ষা ও পরিষ্কারের প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর এয়ার ফিল্টার পরিষ্কার করলে বাতাস চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
মনে রাখবেন, এসি নষ্ট হওয়ার পর মেরামত করানোর চেয়ে নিয়মিত যত্ন নেওয়া ভালো। এতে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচ ও বড় ধরনের মেরামতের ঝুঁকি কমতে পারে এবং দীর্ঘদিন এসির কার্যক্ষমতা বজায় রাখা সহজ হয়।







