বাসার ফ্রিজটি চালু হলেই কি ভেতর থেকে কটকট, টকটক বা খটখট শব্দ আসে? অনেকেই এমন শব্দ শুনে চিন্তিত হয়ে পড়েন। কেউ ভাবেন ফ্রিজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ মনে করেন কম্প্রেসরে বড় কোনো সমস্যা হয়েছে। তবে ফ্রিজ থেকে শব্দ হলেই যে যন্ত্রটি নষ্ট হয়েছে, এমন নয়।
ফ্রিজে ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া চলার সময় কম্প্রেসর, ফ্যান, রেফ্রিজারেন্টের প্রবাহ এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ধরনের শব্দ হতে পারে। কিছু শব্দ স্বাভাবিক, আবার কিছু শব্দ যান্ত্রিক ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনের ইঙ্গিত দেয়। তাই শব্দের ধরন, কখন হচ্ছে এবং কতক্ষণ থাকছে—এসব বিষয় খেয়াল করা জরুরি।
ফ্রিজ চলার সময় কটকট শব্দ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ
ফ্রিজের কটকট শব্দের পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ থাকতে পারে। যেমন—কম্প্রেসর চালু বা বন্ধ হওয়ার সময় রিলে সুইচের শব্দ, তাপমাত্রার পরিবর্তনে ভেতরের প্লাস্টিকের অংশের প্রসারণ-সংকোচন, কুলিং সিস্টেমে রেফ্রিজারেন্টের চলাচল কিংবা ফ্যানের সঙ্গে বরফের সংস্পর্শ। এসব কারণে অল্প সময়ের জন্য শব্দ হলে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
১. কম্প্রেসর চালু বা বন্ধ হওয়ার শব্দ
ফ্রিজের কম্প্রেসর কুলিং সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি নির্দিষ্ট সময় পরপর চালু ও বন্ধ হয়ে ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কম্প্রেসর চালু হওয়ার আগে বা বন্ধ হওয়ার সময় রিলে কিংবা বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থেকে কট বা টিক শব্দ হতে পারে।
আরও পড়ুন-ফ্রিজের পেছনে থাকা কালো জালির কাজ কী? জানুন পরিষ্কারের নিয়ম
সাধারণত এই শব্দ একবার বা অল্প কয়েকবার শোনা যায়। শব্দের পাশাপাশি ফ্রিজ স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হলে এটি অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। তবে বারবার জোরে ক্লিক করার পরও কম্প্রেসর চালু না হলে বা ফ্রিজ ঠান্ডা না হলে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
২. তাপমাত্রার পরিবর্তনে ভেতরের অংশ প্রসারিত বা সংকুচিত হওয়া
ফ্রিজের ভেতরে ঠান্ডা তৈরি হওয়ার সময় বিভিন্ন প্লাস্টিক ও ধাতব অংশের তাপমাত্রা পরিবর্তিত হয়। এতে এসব উপাদান সামান্য প্রসারিত বা সংকুচিত হতে পারে। এই পরিবর্তনের কারণে ভেতরের দেয়াল, তাক বা অন্যান্য অংশ থেকে কটকট, টকটক কিংবা পটপট শব্দ শোনা যায়।
বিশেষ করে রাতে চারপাশ নীরব থাকলে শব্দটি বেশি স্পষ্ট মনে হতে পারে। নতুন ফ্রিজ চালু করার পরও তাপমাত্রা স্থিতিশীল হওয়ার সময় এ ধরনের শব্দ শোনা যেতে পারে।
৩. ফ্রিজের ভেতরে রেফ্রিজারেন্টের চলাচল
ফ্রিজের কুলিং সিস্টেমে রেফ্রিজারেন্ট বা শীতলীকরণ গ্যাস নির্দিষ্ট পথে চলাচল করে। এর চাপ ও অবস্থার পরিবর্তনের সময় পাইপের ভেতর দিয়ে তরল বা গ্যাস প্রবাহিত হওয়ার কারণে গড়গড়, বুদবুদ কিংবা হালকা টকটক শব্দ হতে পারে।
এটি অনেক সময় পানির ফুটন্ত শব্দের মতো শোনায়। ফ্রিজের স্বাভাবিক কুলিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এমন শব্দ হতে পারে। তবে শব্দটি হঠাৎ অস্বাভাবিক জোরে শুরু হলে বা কুলিং কমে গেলে টেকনিশিয়ান দিয়ে পরীক্ষা করানো ভালো।
৪. ফ্যানের সঙ্গে বরফ বা অন্য কিছুর ঘর্ষণ
নো-ফ্রস্ট ফ্রিজে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস ছড়িয়ে দিতে ফ্যান ব্যবহার করা হয়। ফ্যানের আশপাশে বরফ জমে গেলে ব্লেডের সঙ্গে ঘর্ষণ তৈরি হতে পারে। তখন কটকট, খসখস, ঘষাঘষি কিংবা টানা শব্দ শোনা যায়।
ফ্রিজের ভেতরে অস্বাভাবিক বরফ জমা, বাতাস চলাচল কমে যাওয়া বা ফ্যানের শব্দ বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। নিজে ধারালো কিছু দিয়ে বরফ ভাঙার চেষ্টা করবেন না। এতে ফ্রিজের ভেতরের পাইপ বা অন্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৫. ফ্রিজের পেছনের পাইপ বা দেয়ালের সঙ্গে ঘর্ষণ
অনেক সময় ফ্রিজের ভেতরে কোনো সমস্যা থাকে না। বরং পেছনের পাইপ, দেয়াল বা আশপাশের আসবাবের সঙ্গে সংস্পর্শে এসে কম্পনের কারণে কটকট বা খটখট শব্দ হয়। ফ্রিজ চালু হলে কম্প্রেসরের কম্পন বাড়ে, আর সেই কম্পন কাছাকাছি কোনো বস্তুতে লাগলে শব্দ তৈরি হতে পারে।
ফ্রিজের ওপর রাখা বোতল, পাত্র বা অন্য জিনিসও কম্পনের কারণে শব্দ করতে পারে। তাই ফ্রিজের চারপাশ ও ওপরের অংশ পরীক্ষা করা দরকার।
৬. ফ্রিজের বরফ গলানোর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা
আধুনিক নো-ফ্রস্ট ফ্রিজে নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বরফ গলানোর ব্যবস্থা থাকে। এ সময় ভেতরের তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং বরফ গলার পানির কারণে টুকটাক, পটপট, হিসহিস বা পানির ফোঁটা পড়ার মতো শব্দ হতে পারে।
এ ধরনের শব্দ সাধারণত কিছু সময় পর বন্ধ হয়ে যায়। তবে দীর্ঘক্ষণ অস্বাভাবিক শব্দ চলতে থাকলে বা ফ্রিজের ঠান্ডা কমে গেলে সার্ভিস করানো প্রয়োজন হতে পারে।
ফ্রিজের কটকট শব্দ কমাতে যা করবেন
সব ধরনের শব্দের জন্য টেকনিশিয়ান ডাকার প্রয়োজন হয় না। কিছু সাধারণ বিষয় পরীক্ষা করে অনেক সময় কম্পনজনিত শব্দ কমানো সম্ভব।
১. ফ্রিজ সমতল জায়গায় রাখুন
ফ্রিজ যে মেঝেতে রাখা হয়েছে, সেটি সমতল ও শক্ত কি না পরীক্ষা করুন। মেঝে অসমান হলে ফ্রিজের শরীর কাঁপতে পারে। এতে কম্প্রেসর চালু হওয়ার সময় কটকট বা খটখট শব্দ তৈরি হতে পারে।
ফ্রিজের নিচের লেভেলিং পা বা সমন্বয়যোগ্য স্ট্যান্ড ঠিকভাবে বসানো আছে কি না দেখুন। প্রয়োজনে ব্যবহারবিধি অনুযায়ী উচ্চতা সমন্বয় করুন।
২. দেয়াল থেকে প্রয়োজনীয় দূরত্ব রাখুন
ফ্রিজ দেয়ালের একেবারে সঙ্গে লাগিয়ে রাখবেন না। পেছনে বা পাশে পাইপ ও অন্যান্য অংশ দেয়ালে স্পর্শ করলে কম্পনের কারণে শব্দ হতে পারে। পাশাপাশি তাপ বের হওয়ার জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা প্রয়োজন। কতটুকু ফাঁকা রাখতে হবে, তা ফ্রিজের মডেলের নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিক করুন।
৩. ভেতরের বোতল ও পাত্র ঠিকভাবে রাখুন
ফ্রিজের ভেতরে কাচের বোতল, পানির জগ, হাঁড়ি বা খাবারের পাত্র একে অপরের সঙ্গে ঠেকে থাকলে কম্পনের সময় শব্দ হতে পারে। তাক ও ড্রয়ারে রাখা জিনিসপত্র ঠিকভাবে সাজিয়ে রাখুন। ফ্রিজের ওপরেও ভারী বা কম্পন তৈরি করতে পারে এমন বস্তু রাখা এড়িয়ে চলুন।
৪. ফ্রিজের পেছনে ধুলাবালু জমতে দেবেন না
ফ্রিজের পেছনে দৃশ্যমান কনডেনসার কয়েল বা অন্যান্য অংশে ধুলাবালু জমলে তাপ বের হওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এতে ফ্রিজের কার্যক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। আপনার ফ্রিজের মডেলে কয়েল পরিষ্কারের সুযোগ থাকলে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। পরিষ্কারের আগে অবশ্যই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন।
৫. ফ্রিজের দরজা বারবার খুলবেন না
দরজা বারবার খুললে ভেতরে উষ্ণ বাতাস প্রবেশ করে। তখন নির্ধারিত তাপমাত্রায় ফিরতে কম্প্রেসর ও ফ্যানকে বেশি কাজ করতে হতে পারে। এতে স্বাভাবিক কার্যক্রমের শব্দও বেশি শোনা যেতে পারে। প্রয়োজন ছাড়া দরজা খোলা এড়িয়ে চলুন।
কোন ধরনের শব্দ হলে সতর্ক হবেন?
ফ্রিজ থেকে হালকা কটকট শব্দ হওয়া অনেক সময় স্বাভাবিক। তবে কিছু শব্দ যান্ত্রিক সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না।
-
বারবার জোরে ক্লিক শব্দ: কম্প্রেসর চালু হওয়ার চেষ্টা করেও চালু না হলে বা বারবার বন্ধ হয়ে গেলে রিলে, স্টার্টিং ব্যবস্থা কিংবা কম্প্রেসর পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
-
একটানা ঘষাঘষির শব্দ: ফ্যানের সঙ্গে বরফ বা অন্য কোনো অংশের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
-
অস্বাভাবিক জোরে কম্পন: ফ্রিজের অবস্থান, পেছনের পাইপ, ফ্যান বা কম্প্রেসরের কোনো সমস্যা থাকতে পারে।
-
কটকট শব্দের সঙ্গে কুলিং কমে যাওয়া: এটি স্বাভাবিক শব্দের বাইরে অন্য কোনো ত্রুটির লক্ষণ হতে পারে।
-
পোড়া গন্ধ বা বৈদ্যুতিক স্পার্ক: সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ উপায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন এবং টেকনিশিয়ানের সাহায্য নিন।
শব্দ যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে কিংবা ফ্রিজের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করে, তাহলে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টার বা দক্ষ টেকনিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
ফ্রিজের শব্দ নিজে পরীক্ষা করার সময় যেসব ভুল করবেন না
শব্দের উৎস বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে ফ্রিজের ভেতরের যন্ত্রাংশ খুলে ফেলা উচিত নয়। বিশেষ করে কম্প্রেসর, বৈদ্যুতিক রিলে, ফ্যান মোটর বা কুলিং সিস্টেমের পাইপে নিজে হাত দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকুন—
১. ফ্রিজ চালু থাকা অবস্থায় পেছনের বৈদ্যুতিক অংশ স্পর্শ করবেন না।
২. ধারালো বস্তু দিয়ে ফ্রিজের ভেতরের বরফ ভাঙবেন না।
৩. ফ্যান বা কম্প্রেসরে তেল কিংবা লুব্রিকেন্ট দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।
৪. বৈদ্যুতিক সংযোগে সমস্যা হলে নিজে মেরামত করবেন না।
৫. শব্দের পাশাপাশি কুলিং সমস্যা থাকলে শুধু ফ্রিজ বন্ধ করে আবার চালু করে সমস্যাটি উপেক্ষা করবেন না।
শেষ কথা
ফ্রিজ চলার সময় কটকট শব্দ হলেই সেটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা ঠিক নয়। কম্প্রেসর চালু বা বন্ধ হওয়া, তাপমাত্রার পরিবর্তন, রেফ্রিজারেন্টের চলাচল কিংবা স্বয়ংক্রিয় বরফ গলানোর প্রক্রিয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেও এ ধরনের শব্দ হতে পারে।
তবে শব্দ যদি আগের তুলনায় বেশি হয়, একটানা চলতে থাকে কিংবা ফ্রিজের ঠান্ডা কমে যায়, তাহলে অবহেলা করা উচিত নয়। ফ্রিজ সমতল জায়গায় রাখা, দেয়াল থেকে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখা এবং ভেতরের জিনিসপত্র ঠিকভাবে সাজিয়ে রাখার মতো ছোট কিছু অভ্যাসে অপ্রয়োজনীয় শব্দ কমানো সম্ভব। সমস্যা থাকলে দক্ষ টেকনিশিয়ানের সাহায্য নিন।









1 thought on “ফ্রিজ চালু হলেই শব্দ হয়? কম্প্রেসর নষ্ট নাকি স্বাভাবিক ঘটনা?”
Comments are closed.