স্মার্টফোন হারিয়ে গেলে শুধু নতুন ফোন কেনার খরচই নয়, ব্যক্তিগত ছবি, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্যও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই ফোন হারানোর পর দেরি না করে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমেই সিম বন্ধ করুন, ফোনটি দূর থেকে লক করার চেষ্টা করুন, আর্থিক অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করুন এবং প্রয়োজন হলে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করুন।
আরও পড়ুন-ফোন চার্জ দেওয়ার সময় ব্যাক কভার খোলা জরুরি কি?
১. দ্রুত সিম কার্ড বন্ধ করুন
ফোন হারানোর পর প্রথম কাজ হলো সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করা। গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে ফোন করে হারানো সিমটি সাময়িকভাবে বন্ধ বা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা নিন।
সিমটি অন্য কারও হাতে গেলে আপনার নম্বরে আসা ওটিপি বা যাচাইকরণ কোডের অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে ফোন নম্বর যুক্ত থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সিম বন্ধ করার পাশাপাশি বিকাশ, নগদসহ যেসব আর্থিক সেবা ব্যবহার করেন, সেগুলোর গ্রাহকসেবায় যোগাযোগ করে অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন। কোনো সন্দেহজনক লেনদেন হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জানান।
২. অন্য ডিভাইস থেকে ফোন লক বা খুঁজে দেখুন
ফোনের অবস্থান শনাক্ত করার সুবিধা আগে থেকে চালু থাকলে অন্য ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে সেটি খোঁজার চেষ্টা করতে পারেন।
অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ক্ষেত্রে: গুগলের Find Hub ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে ফোনে ব্যবহৃত একই গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে সাইন ইন করুন। এরপর তালিকা থেকে হারানো ফোনটি নির্বাচন করে অবস্থান দেখুন, শব্দ বাজান অথবা উপলভ্য থাকলে ফোনটি লক করার ব্যবস্থা নিন।
আইফোনের ক্ষেত্রে: iCloud Find Devices খুলে অ্যাপল অ্যাকাউন্ট দিয়ে প্রবেশ করুন। এরপর হারানো আইফোন নির্বাচন করে Find My-এর মাধ্যমে অবস্থান দেখুন এবং Lost Mode চালু করুন। এতে ফোনটি লক করা এবং প্রয়োজনে যোগাযোগের তথ্য দেখানোর সুযোগ রয়েছে।
ফোন বন্ধ থাকলে বা ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে অবস্থান পাওয়া নাও যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ জানা অবস্থান দেখা যেতে পারে। ফোনটি চুরি হয়ে থাকলে অপরিচিত স্থানে নিজে গিয়ে উদ্ধার করার চেষ্টা না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিন।
ফোন আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে এবং ব্যক্তিগত তথ্যের ঝুঁকি বেশি হলে দূর থেকে ডেটা মুছে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। তবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মনে রাখবেন, ডেটা মুছে দিলে কিছু ডিভাইসে পরবর্তী অবস্থান শনাক্ত করার সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
৩. গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্ট ও ব্যাংকিং সেবা সুরক্ষিত করুন
ফোন হারানোর পর শুধু সিম বন্ধ করলেই সব ঝুঁকি দূর হয় না। অন্য ডিভাইস থেকে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলো পরীক্ষা করুন।
- গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট: অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা সেটিংস পরীক্ষা করুন এবং অচেনা কার্যক্রম দেখা গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।
- ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: সক্রিয় সেশন পরীক্ষা করে হারানো ফোনের সেশন থেকে লগআউট করুন। সন্দেহ হলে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।
- হোয়াটসঅ্যাপ: নিজের নম্বরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সিম পুনরুদ্ধার করুন এবং অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশের লক্ষণ থাকলে দ্রুত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিন।
- মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংকিং অ্যাপ: সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে সুরক্ষিত বা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্লক করুন।
যে অ্যাকাউন্টগুলোর পাসওয়ার্ড ফোনে সংরক্ষিত ছিল, সেগুলোর নিরাপত্তাও পর্যালোচনা করুন। কেউ ফোন খুঁজে পেয়েছে দাবি করে পাসওয়ার্ড, ওটিপি বা যাচাইকরণ কোড চাইলে তা দেবেন না।
৪. থানায় সাধারণ ডায়েরি করুন
ফোন হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার বিষয়টি বিবেচনা করুন। ফোনের ব্র্যান্ড, মডেল, রং, হারানোর সময় ও স্থান এবং আইএমইআই নম্বরসহ যতটা সম্ভব নির্ভুল তথ্য দিন। কেনার রসিদ বা ফোনের বাক্স থাকলে সেগুলো থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
আইএমইআই হলো মোবাইল ডিভাইস শনাক্ত করার একটি স্বতন্ত্র নম্বর। সাধারণত ফোনে *#06# ডায়াল করলে নম্বরটি দেখা যায়; ফোন হাতে না থাকলে বাক্স, ক্রয় রসিদ বা আগে সংরক্ষিত তথ্য থেকে এটি খুঁজে দেখতে পারেন। ডুয়াল-সিম ফোনে একাধিক আইএমইআই থাকতে পারে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) NEIR পোর্টাল ব্যবহার করে আইএমইআই-সংক্রান্ত তথ্য ও ডিভাইসের অবস্থা যাচাই করা যায়। হারানো ফোনের বিষয়ে পরবর্তী করণীয় জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
৫. ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিন
ফোন হারানোর পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয় যদি আগে থেকেই কিছু নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু রাখা থাকে।
- সহজে অনুমান করা যায় এমন পিনের পরিবর্তে শক্তিশালী স্ক্রিন লক ব্যবহার করুন।
- ফোনে আঙুলের ছাপ বা মুখ শনাক্তকরণের মতো সুবিধা থাকলে চালু রাখুন।
- অ্যান্ড্রয়েডে Find Hub এবং আইফোনে Find My-এর মতো ডিভাইস খোঁজার সুবিধা আগে থেকেই সক্রিয় রাখুন।
- গুরুত্বপূর্ণ ছবি, নথি ও যোগাযোগের তথ্য নিয়মিত নিরাপদ জায়গায় ব্যাকআপ রাখুন।
- আইএমইআই নম্বর, ফোনের মডেল ও ক্রয় রসিদ নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করুন।
- লক স্ক্রিনে বিকল্প যোগাযোগের তথ্য দিতে চাইলে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করে নিরাপদ কোনো নম্বর ব্যবহার করুন।
ফোন হারানোর পর আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত সিম ও আর্থিক অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করা, ফোন লক করার চেষ্টা এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগে থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু থাকলে ব্যক্তিগত তথ্যের ঝুঁকি কমানো এবং ফোন উদ্ধারের চেষ্টা করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪









