ফ্রিজারের ভেতরে খাবার রাখার জায়গা কমে যাচ্ছে, ড্রয়ার খুলতে কষ্ট হচ্ছে কিংবা দেয়ালে জমে থাকা বরফের স্তর ক্রমেই পুরু হচ্ছে—এমন সমস্যায় অনেকেই পড়েন। বিশেষ করে যেসব ফ্রিজে নিয়মিত বরফ জমে, সেগুলোতে একসময় ফ্রিজারের ভেতর বরফের স্তূপ তৈরি হতে পারে। এতে খাবার সংরক্ষণের জায়গা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ফ্রিজের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে।
আরও পড়ুন-ফ্রিজের তাপমাত্রা ভুল রাখছেন না তো? জেনে নিন সঠিক নিয়ম
তবে কিছু ফ্রিজে বরফ গলানোর জন্য আলাদা ডিফ্রস্ট (Defrost) বাটন বা সুইচ থাকে। এই বাটন ব্যবহার করে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে জমে থাকা বরফ গলানো যায়। কিন্তু সব ফ্রিজে এই সুবিধা থাকে না। আবার নো-ফ্রস্ট বা অটোমেটিক ডিফ্রস্ট ফ্রিজে আলাদা বাটন খুঁজে না পেলেও সেটি স্বাভাবিক।
ফ্রিজের ডিফ্রস্ট বাটন কীভাবে কাজ করে?
ডিফ্রস্ট বাটনের কাজ হলো ফ্রিজের জমে থাকা বরফ গলানোর প্রক্রিয়া শুরু করা। বিশেষ করে ডাইরেক্ট কুল বা ম্যানুয়াল ডিফ্রস্ট প্রযুক্তির কিছু ফ্রিজে ফ্রিজারের ভেতরে কিংবা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের নবের পাশে এই বাটন থাকে।
সাধারণত বাটন চাপলে ফ্রিজের কুলিং সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ফ্রিজারের ভেতরে জমে থাকা বরফ ধীরে ধীরে গলতে শুরু করে। বরফ গলে গেলে অনেক মডেলে বাটনটি আগের অবস্থায় ফিরে আসে এবং ফ্রিজ আবার স্বাভাবিকভাবে চালু হয়।
বাংলাদেশে বাজারে থাকা কিছু ফ্রিজের নির্দেশিকাতেও এই সুবিধার কথা উল্লেখ রয়েছে। যেমন, স্যামসাংয়ের নির্দিষ্ট ডাইরেক্ট কুল মডেলে ফ্রিজারের ভেতরের ডিফ্রস্ট বাটন চাপলে বরফ গলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আবার ওয়ালটনের কিছু নো-ফ্রস্ট মডেলে নির্দিষ্ট দুটি টাচ বাটন একসঙ্গে কয়েক সেকেন্ড চেপে ম্যানুয়াল ডিফ্রস্ট চালু করতে হয়। অর্থাৎ, সব ফ্রিজে বাটনের অবস্থান বা ব্যবহারের নিয়ম এক নয়।
কীভাবে ব্যবহার করবেন?
১. প্রথমে ফ্রিজের মডেল অনুযায়ী ব্যবহারবিধি দেখে নিন।
২. ফ্রিজারের ভেতরে থাকা খাবার ও বরফের ট্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সরিয়ে রাখুন।
৩. নির্দেশিকায় বলা থাকলে নির্দিষ্ট ডিফ্রস্ট বাটন চাপুন বা নির্ধারিত বাটনগুলো একসঙ্গে চেপে ধরুন।
৪. বরফ গলার সময় পানি জমতে পারে। তাই পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখুন এবং প্রয়োজন হলে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিন।
৫. ডিফ্রস্ট প্রক্রিয়া শেষ হলে ফ্রিজ আবার স্বাভাবিকভাবে চালু হচ্ছে কি না খেয়াল করুন।
মনে রাখবেন, বাটন কতক্ষণ চেপে রাখতে হবে কিংবা প্রক্রিয়া শেষ হতে কত সময় লাগবে, তা ফ্রিজের মডেলভেদে আলাদা হতে পারে। তাই অনুমান করে বাটন চাপার পরিবর্তে নিজস্ব ফ্রিজের নির্দেশিকা অনুসরণ করুন।
কোন ফ্রিজে এই বাটন থাকে?
সব ফ্রিজে আলাদা ডিফ্রস্ট বাটন থাকে না। সাধারণভাবে ফ্রিজের ডিফ্রস্ট ব্যবস্থা দুই ধরনের হতে পারে।
১. ম্যানুয়াল ডিফ্রস্ট বা ডাইরেক্ট কুল ফ্রিজ
এ ধরনের ফ্রিজে ফ্রিজারের ভেতরে বরফ জমতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পরপর ব্যবহারকারীকে নিজে বরফ গলাতে হয়। কিছু মডেলে এ কাজের জন্য আলাদা ডিফ্রস্ট বাটন দেওয়া থাকে।
২. নো-ফ্রস্ট বা অটোমেটিক ডিফ্রস্ট ফ্রিজ
এ ধরনের ফ্রিজে সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিফ্রস্ট প্রক্রিয়া চলে। ফলে ব্যবহারকারীকে নিয়মিত হাতে বরফ গলাতে হয় না। তবে ডিফ্রস্ট ব্যবস্থা, হিটার, সেন্সর বা ড্রেন লাইনে সমস্যা হলে বরফ জমতে পারে।
ফ্রিজারে অতিরিক্ত বরফ জমে কেন?
ডিফ্রস্ট বাটন ব্যবহার করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। বরফ জমার কারণও খুঁজে বের করা জরুরি। কয়েকটি সাধারণ কারণ হলো—
-
বারবার দরজা খোলা: ঘরের উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস ফ্রিজারে ঢুকে ঠান্ডা পৃষ্ঠে জমে বরফ তৈরি করে।
-
দরজার রাবার নষ্ট হওয়া: দরজার গ্যাসকেট ঠিকভাবে আটকে না থাকলে বাইরের বাতাস ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।
-
গরম খাবার রাখা: গরম খাবার থেকে বের হওয়া জলীয় বাষ্প ফ্রিজারের ভেতরে বরফ জমাতে সহায়তা করে।
-
বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ: খাবার বা প্যাকেট দিয়ে ভেতরের ভেন্ট ঢেকে রাখলে স্বাভাবিক বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
-
তাপমাত্রা ভুলভাবে সেট করা: প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ঠান্ডা সেটিং থাকলেও কিছু মডেলে বরফ জমার সমস্যা বাড়তে পারে।
যদি বরফ গলানোর পর অল্প সময়ের মধ্যেই আবার পুরু বরফ জমে, তাহলে শুধু ডিফ্রস্ট করে সমস্যাটি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। দরজার রাবার, ড্রেন লাইন এবং ফ্রিজের ডিফ্রস্ট ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি আছে কি না পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
ডিফ্রস্ট বাটন না থাকলে কী করবেন?
আপনার ফ্রিজে ডিফ্রস্ট বাটন না থাকলে চিন্তার কিছু নেই। মডেলটি ম্যানুয়াল ডিফ্রস্ট সমর্থন করলে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দরজা খুলে রেখে স্বাভাবিকভাবে বরফ গলাতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করুন—
১. ফ্রিজের ভেতরের খাবার বের করে ঠান্ডা রাখার উপযুক্ত জায়গায় সংরক্ষণ করুন।
২. ফ্রিজের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন।
৩. ফ্রিজারের দরজা খুলে রাখুন, যাতে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় বরফ গলে যায়।
৪. গলা পানি শোষণ করার জন্য ফ্রিজের ভেতরে ও সামনে তোয়ালে বা কাপড় রাখুন।
৫. বরফ সম্পূর্ণ গলে গেলে ভেতরের অংশ শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিন।
৬. ফ্রিজ আবার চালু করে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় পৌঁছানোর পর খাবার রাখুন।
বরফ দ্রুত গলানোর জন্য ছুরি, স্ক্রু ড্রাইভার বা অন্য কোনো ধারালো বস্তু ব্যবহার করবেন না। হেয়ার ড্রায়ার, হিটার কিংবা সরাসরি আগুন দিয়েও বরফ গলানোর চেষ্টা করবেন না। এতে ফ্রিজারের ভেতরের অংশ, কুলিং পাইপ বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বরফ জমা কমাতে যেসব অভ্যাস গড়ে তুলবেন
ফ্রিজারে বারবার বরফ জমার সমস্যা এড়াতে কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস কাজে আসতে পারে।
-
অপ্রয়োজনে ফ্রিজারের দরজা দীর্ঘক্ষণ খুলে রাখবেন না।
-
দরজার রাবার নিয়মিত পরিষ্কার করুন এবং ঠিকভাবে আটকে যাচ্ছে কি না দেখুন।
-
গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখবেন না; আগে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ঠান্ডা হতে দিন।
-
ফ্রিজারের ভেতরের বাতাস চলাচলের পথ খাবার বা প্যাকেট দিয়ে আটকে রাখবেন না।
-
ফ্রিজের তাপমাত্রা প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী সেট করুন।
-
ম্যানুয়াল ডিফ্রস্ট ফ্রিজ হলে বরফের স্তর পুরু হওয়ার আগেই নির্দেশিকা অনুযায়ী বরফ গলান।
কখন টেকনিশিয়ানের সাহায্য নেবেন?
ডিফ্রস্ট বাটন চাপার পরও যদি বরফ না গলে, বাটন আগের অবস্থায় ফিরে না আসে কিংবা ফ্রিজের কুলিং স্বাভাবিক না হয়, তাহলে নিজে ভেতরের যন্ত্রাংশ খুলবেন না। দক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে পরীক্ষা করান।
বিশেষ করে নো-ফ্রস্ট ফ্রিজে বারবার বরফ জমলে ডিফ্রস্ট হিটার, সেন্সর, টাইমার, কন্ট্রোল বোর্ড বা ড্রেন ব্যবস্থায় সমস্যা থাকতে পারে। এসব পরীক্ষা ও মেরামতের জন্য পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন।
শেষ কথা
ফ্রিজারের ভেতরে পাহাড়সম বরফ জমলে প্রথমেই ফ্রিজে ডিফ্রস্ট বাটন আছে কি না খুঁজে দেখুন। থাকলে মডেলের নির্দেশনা অনুযায়ী সেটি ব্যবহার করুন। তবে মনে রাখবেন, সব ফ্রিজে এই বাটন থাকে না এবং সব মডেলের ডিফ্রস্ট পদ্ধতিও এক নয়। তাই বাটন খুঁজে না পেলে বা ব্যবহারবিধি বুঝতে সমস্যা হলে ফ্রিজের ম্যানুয়াল দেখে নিন। নিয়মিত যত্ন নিলে বরফ জমার সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সূত্র: Dhakamail







