বাংলাদেশে টুজি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে টুজি সেবা বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু টুজি নেটওয়ার্কে চলা বাটনফোন ব্যবহারকারীদের নতুন প্রযুক্তির ফোনে যেতে হবে। এতে স্বল্প আয়ের মানুষ ও প্রবীণ গ্রাহকদের বাড়তি খরচের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন-মোবাইলে ইমার্জেন্সি ব্যালান্স ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব, ফি কত হতে পারে?
বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পর নতুন টুজি ফোনের মডেল অনুমোদন বন্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের পর দেশে টুজি ফোন উৎপাদন বন্ধ এবং একই বছরের ৩০ জুনের পর এসব ফোনের বিক্রি বন্ধের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে টুজি সেবা বন্ধ করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে রোডম্যাপটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে প্রস্তাবিত সময়সীমাকে এখনই কার্যকর নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কেন টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে চায় বিটিআরসি
টুজি থেকে ফোরজি নেটওয়ার্কে স্থানান্তরের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মোবাইল নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানো এবং তরঙ্গের ব্যবহার আরও কার্যকর করা। টুজি নেটওয়ার্কের জন্য ব্যবহৃত তরঙ্গ ফোরজি সেবায় কাজে লাগানো গেলে অপারেটরদের ডেটা সরবরাহের সক্ষমতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি পুরোনো প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকেও পুরোনো নেটওয়ার্ক থেকে সরে আসার পক্ষে মত এসেছে। বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, টুজি থেকে ফোরজিতে স্থানান্তর করা গেলে তরঙ্গ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। তাঁর মতে, অপারেটরদের নেটওয়ার্ক এখন মূলত ডেটা সেবাকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো হচ্ছে।
তবে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের সুবিধা পেতে হলে গ্রাহকদেরও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সামর্থ্য থাকতে হবে। এ জায়গাতেই বড় চ্যালেঞ্জ দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কেন ঝুঁকিতে বাটনফোন ব্যবহারকারীরা
বাটনফোন এখনো দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম। সহজ ব্যবহার, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি এবং কম দাম—এই তিন কারণে এসব ফোনের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ, স্বল্প আয়ের এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভ্যস্ত মানুষের কাছে বাটনফোন সুবিধাজনক।
বিটিআরসির তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশের ব্যবহৃত হ্যান্ডসেটের প্রায় ৩৫ শতাংশ ছিল ফিচার ফোন। আর প্রায় ১৯ কোটি মোবাইল সাবস্ক্রিপশনের মধ্যে ৬ কোটি ৫০ লাখের বেশি ব্যবহারকারী ফিচার ফোন ব্যবহার করেন। তবে সব ফিচার ফোন শুধু টুজি নেটওয়ার্কে চলে না; কিছু ফোনে তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক সমর্থনও রয়েছে।
স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরাও অনেক সময় বিকল্প হিসেবে বাটনফোন রাখেন। সাধারণ কল করা, ক্ষুদে বার্তা পাঠানো কিংবা দীর্ঘ সময় ব্যাটারি ব্যাকআপ পাওয়ার জন্য এসব ফোনের ব্যবহার রয়েছে। ফলে শুধু নেটওয়ার্ক পরিবর্তন নয়, কম খরচে সহজ যোগাযোগের সুযোগ ধরে রাখাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সাশ্রয়ী স্মার্টফোন কি বিকল্প হতে পারবে
টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনার সঙ্গে কম দামে স্মার্টফোন সরবরাহের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সরকার পাঁচ হাজার টাকা দামের স্মার্টফোন বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের ফোনের বাজারে আসা, প্রকৃত মূল্য এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য—সবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবচেয়ে সস্তা স্মার্টফোনের দাম ৯ হাজার ৫০০ টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রায় ৯৫০ টাকায় ফিচার ফোন পাওয়া যায়। এই বড় ব্যবধানের কারণে পাঁচ হাজার টাকার স্মার্টফোনও অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে।
এ ছাড়া শুধু ফোনের দাম কম হলেই হবে না। ফোরজি নেটওয়ার্কে নির্ভরযোগ্য ভয়েস কল, প্রয়োজনীয় সেবা ব্যবহারের সহজ ব্যবস্থা এবং গ্রামাঞ্চলে ভালো নেটওয়ার্ক কাভারেজ নিশ্চিত করাও জরুরি। নতুন ফোন ব্যবহারের জন্য মানুষের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অভ্যাসের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
দেশীয় মোবাইল উৎপাদকদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে
টুজি ফোন উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশীয় হ্যান্ডসেট নির্মাতাদের ব্যবসায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। কম দামের ফিচার ফোনের বাজার সংকুচিত হলে উৎপাদকদের নতুন প্রযুক্তির ফোন তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ ও ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও কঠিন হতে পারে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সেগুলোর ব্যয় বাড়ছে। তবে দ্রুত টুজি সেবা বন্ধ করলে গ্রাহক ও উৎপাদক—উভয় পক্ষের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি জাকারিয়া শহীদও টুজি থেকে ফোরজিতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে দরিদ্র গ্রাহকদের সক্ষমতা ও স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, টুজি নেটওয়ার্ক থেকে ফোরজিতে স্থানান্তর বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতকে আধুনিক করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এ পরিবর্তনের সুফল পেতে হলে সাশ্রয়ী ফোন, নির্ভরযোগ্য ভয়েস সেবা এবং গ্রাহকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষের যোগাযোগের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
সূত্র: আরটিভি









