স্মার্টফোন চার্জে দিয়ে ব্যবহার করার সময় ফোনের গায়ে হাত রাখলে কি হালকা শিরশির অনুভূতি হয়? কখনো মনে হয় আঙুলের নিচে সূক্ষ্ম কম্পন হচ্ছে, আবার কখনো ধাতব অংশে স্পর্শ করলেই বিদ্যুতের ঝাঁকুনির মতো লাগে। অনেকেই বিষয়টিকে ছোটখাটো সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। কেউ কেউ আবার মনে করেন, ফোনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন-কোন কেবলে দ্রুত চার্জ হয় ফোন? টাইপ এ নাকি টাইপ সি
বাস্তবে চার্জে থাকা ফোনে এমন অনুভূতির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। চার্জারের নকশা, সামান্য বিদ্যুৎ লিকেজ, বৈদ্যুতিক আর্থিংয়ের ঘাটতি, নিম্নমানের চার্জার বা ক্ষতিগ্রস্ত কেবল সবই সম্ভাব্য কারণ। কিছু ক্ষেত্রে ধাতব কাঠামোর ফোনে চার্জিংয়ের সময় খুব সামান্য স্পর্শ-কারেন্ট বা মাইক্রো-কম্পনের অনুভূতি হতে পারে। তবে প্রতিটি শিরশির অনুভূতিকেই নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
চার্জে থাকা ফোনে হাত দিলে শক লাগে কেন?
চার্জে থাকা ফোনে হাত দিলে শিরশির বা ঝাঁকুনির মতো অনুভূতি হওয়ার কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো চার্জারের সামান্য লিকেজ কারেন্ট, আর্থিংয়ের সমস্যা এবং চার্জার-কেবলের ত্রুটি।
১. চার্জার থেকে সামান্য বিদ্যুৎ লিকেজ
চার্জে থাকা ফোনে হালকা শিরশির অনুভূতির একটি সম্ভাব্য কারণ হলো লিকেজ কারেন্ট বা অতি সামান্য বিদ্যুৎ প্রবাহ। বিশেষ করে দুই পিনের চার্জারে গ্রাউন্ডিং বা আর্থ সংযোগ না থাকলে চার্জারের ভেতরের কিছু বৈদ্যুতিক উপাদানের কারণে ফোনের ধাতব কাঠামোয় সামান্য বৈদ্যুতিক বিভব তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় ফোনের ধাতব অংশে স্পর্শ করলে কারও কারও আঙুলে হালকা শিরশির বা কম্পনের মতো অনুভূতি হয়। প্রযুক্তিগতভাবে একে টাচ কারেন্ট বা স্পর্শ-কারেন্টের অনুভূতি বলা হয়।
তবে সব চার্জারের লিকেজ কারেন্ট নিরাপদ সীমায় থাকে, এমন নিশ্চয়তা নেই। চার্জার নিম্নমানের বা ত্রুটিপূর্ণ হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
২. ফোনের ধাতব বডির কারণে শিরশির অনুভূতি
কিছু স্মার্টফোনের বডি অ্যালুমিনিয়াম বা অন্য ধাতব উপাদান দিয়ে তৈরি। চার্জে থাকা অবস্থায় এমন ফোনের ধাতব অংশ স্পর্শ করলে কোনো কোনো ব্যবহারকারীর কাছে সূক্ষ্ম কম্পন বা শিরশির অনুভূত হতে পারে।
এ বিষয়ে স্যামসাংয়ের সহায়তা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কিছু ধাতব বডির ফোনে চার্জিংয়ের সময় ব্যবহারকারীরা যে মৃদু কম্পন অনুভব করেন, তা সব ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ লিকেজের কারণে হয় না। ফোনের গঠন ও ব্যবহারের পরিবেশের কারণে তৈরি হওয়া সূক্ষ্ম কম্পনকেও অনেকে বিদ্যুৎ প্রবাহের অনুভূতি বলে মনে করতে পারেন।
তবে এই ব্যাখ্যা দিয়ে সব ধরনের শককে স্বাভাবিক বলা যাবে না। অনুভূতি তীব্র হলে বা চার্জার নিয়ে সন্দেহ থাকলে ব্যবহার বন্ধ করে পরীক্ষা করানো উচিত।
৩. চার্জারের মান ভালো না হওয়া
বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চার্জার পাওয়া যায়। সব চার্জারের মান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা এক নয়। নিম্নমানের চার্জারে প্রয়োজনীয় ইনসুলেশন, বৈদ্যুতিক সুরক্ষা কিংবা ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা যথাযথ নাও থাকতে পারে।
এ ধরনের চার্জার ব্যবহারে ফোনের চার্জিং অস্বাভাবিক হওয়া, চার্জার অতিরিক্ত গরম হওয়া কিংবা বৈদ্যুতিক ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে অজানা ব্র্যান্ডের সস্তা চার্জার, নকল অ্যাডাপ্টার কিংবা ফোনের উপযোগী নয় এমন চার্জার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
৪. চার্জিং কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
অনেক সময় সমস্যার কারণ চার্জার নয়, বরং চার্জিং কেবল। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে কেবলের বাইরের আবরণ ছিঁড়ে যেতে পারে, ভেতরের তার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিংবা সংযোগকারী অংশ ঢিলা হয়ে যেতে পারে।
কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে চার্জিংয়ের সমস্যা, অতিরিক্ত গরম হওয়া বা বৈদ্যুতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কেবলের কোনো অংশে তার বের হয়ে থাকলে, প্লাগ বাঁকা হলে কিংবা সংযোগস্থলে পোড়া দাগ দেখা গেলে সেটি ব্যবহার করা উচিত নয়।
অ্যাপলের নিরাপত্তা নির্দেশনাতেও ক্ষতিগ্রস্ত চার্জার বা কেবল ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৫. বাসার বৈদ্যুতিক সকেট বা আর্থিংয়ের সমস্যা
ফোনে শিরশির অনুভূতির পেছনে বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগও দায়ী হতে পারে। বিশেষ করে সকেটের আর্থিং ঠিক না থাকলে, সংযোগ ঢিলা হলে কিংবা বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে চার্জিংয়ের সময় অস্বাভাবিক অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
দুই পিনের চার্জারে সাধারণত আলাদা আর্থ সংযোগ থাকে না। অন্যদিকে, উপযুক্ত তিন পিনের চার্জার ও সঠিক আর্থিংযুক্ত বৈদ্যুতিক সংযোগে অতিরিক্ত কারেন্টের নিরাপদ নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে শুধু তিন পিনের চার্জার ব্যবহার করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; সকেট ও আর্থিংও সঠিক হতে হবে।
৬. শরীরে জমে থাকা স্ট্যাটিক বিদ্যুৎ
কখনো কখনো ফোনে হাত দিলে যে হালকা ঝাঁকুনি অনুভূত হয়, সেটি চার্জারের কারণে নয়; বরং শরীরে জমে থাকা স্থির বিদ্যুতের কারণেও হতে পারে। শুষ্ক পরিবেশে, বিশেষ ধরনের পোশাক পরলে কিংবা কার্পেটের ওপর হাঁটাচলা করলে শরীরে স্থির বৈদ্যুতিক চার্জ জমতে পারে।
পরে কোনো ধাতব বস্তু স্পর্শ করলে সেই চার্জ দ্রুত আদান-প্রদান হয় এবং আঙুলে হালকা ঝাঁকুনি অনুভূত হতে পারে। তবে ফোন চার্জে থাকা অবস্থায় বারবার শিরশির করলে শুধু স্ট্যাটিক বিদ্যুৎকে দায়ী না করে চার্জার ও বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা করা জরুরি।
ফোনে শিরশির অনুভূতি হলে কী করবেন?
চার্জে থাকা ফোনে অস্বাভাবিক অনুভূতি হলে প্রথম কাজ হলো নিরাপদ থাকা। সমস্যাটি ছোট মনে হলেও পরীক্ষা না করে একই চার্জার ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
১. চার্জার থেকে ফোন বিচ্ছিন্ন করুন: শিরশির বা ঝাঁকুনি অনুভব করলে ফোনের গা স্পর্শ করে পরীক্ষা করতে থাকবেন না। নিরাপদভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে চার্জার খুলে ফেলুন।
২. চার্জার ও কেবল পরীক্ষা করুন: চার্জারের গায়ে ফাটল, পোড়া দাগ, অস্বাভাবিক গরম হওয়া কিংবা কেবলের আবরণ ছেঁড়া আছে কি না দেখুন। কোনো ত্রুটি থাকলে সেটি আর ব্যবহার করবেন না।
৩. মানসম্মত চার্জার ব্যবহার করুন: ফোনের নির্মাতার অনুমোদিত বা নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের উপযুক্ত চার্জার ব্যবহার করুন। চার্জারের পাওয়ার ও চার্জিং প্রযুক্তি ফোনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না নিশ্চিত করুন।
৪. বৈদ্যুতিক সকেট পরীক্ষা করান: একই সমস্যা একাধিক চার্জার বা সকেটেও হলে বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগ ও আর্থিং পরীক্ষা করান। এ কাজ দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ানকে দিয়ে করানো উচিত।
৫. ভেজা হাতে ফোন ধরবেন না: ফোন চার্জে থাকা অবস্থায় ভেজা হাত দিয়ে ফোন, চার্জার বা বৈদ্যুতিক সকেট স্পর্শ করবেন না। বাথরুম বা পানির কাছাকাছি জায়গায় ফোন চার্জ দেওয়া এড়িয়ে চলুন।
৬. সমস্যা চলতে থাকলে সার্ভিস সেন্টারে যান: ভালো মানের চার্জার ও কেবল ব্যবহারের পরও সমস্যা থাকলে ফোন, চার্জার ও কেবল অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে পরীক্ষা করান।
কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত সতর্ক হবেন?
হালকা শিরশির অনুভূতি এবং প্রকৃত বৈদ্যুতিক শক এক বিষয় নয়। তাই নিচের লক্ষণগুলো দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
-
ফোন স্পর্শ করলে ব্যথাযুক্ত বা তীব্র বৈদ্যুতিক ঝাঁকুনি অনুভূত হওয়া।
-
চার্জার বা কেবল অস্বাভাবিক গরম হয়ে যাওয়া।
-
চার্জারের প্লাগ বা সকেটে স্পার্ক দেখা।
-
ফোন চার্জে দিলে পোড়া গন্ধ বের হওয়া।
-
চার্জিংয়ের সময় ধোঁয়া বা অস্বাভাবিক শব্দ হওয়া।
-
কেবলের আবরণ ছিঁড়ে যাওয়া বা ভেতরের তার দেখা যাওয়া।
-
বাসার একাধিক বৈদ্যুতিক যন্ত্র স্পর্শ করলেও শক অনুভূত হওয়া।
এমন পরিস্থিতিতে চার্জার ব্যবহার বন্ধ করুন। নিরাপদে সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট সার্কিটের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ানের সাহায্য নিন। পোড়া গন্ধ, ধোঁয়া বা স্পার্ক দেখা গেলে নিজে চার্জার খুলে মেরামতের চেষ্টা করবেন না।
ফোন চার্জ দেওয়ার সময় নিরাপদ থাকতে ৮টি অভ্যাস
১. ফোনের নির্মাতার অনুমোদিত বা নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের চার্জার ব্যবহার করুন।
২. চার্জিং কেবল ছেঁড়া, ফাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবর্তন করুন।
৩. ভেজা হাতে চার্জার, কেবল বা ফোন স্পর্শ করবেন না।
৪. বিছানা, বালিশ বা কম্বলের নিচে ফোন রেখে চার্জ দেবেন না।
৫. চার্জার ও ফোনের চারপাশে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন।
৬. ঢিলা, পোড়া দাগযুক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক সকেট ব্যবহার করবেন না।
৭. ফোন চার্জে থাকা অবস্থায় অস্বাভাবিক গরম হলে চার্জিং বন্ধ করুন।
৮. ফোন বা চার্জার থেকে বারবার শক অনুভূত হলে পরীক্ষা না করিয়ে ব্যবহার চালিয়ে যাবেন না।
চার্জে থাকা ফোন ব্যবহার করা কি নিরাপদ?
সঠিক মানের চার্জার, ভালো কেবল এবং নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহার করলে ফোন চার্জে থাকা অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যায়। তবে চার্জিংয়ের সময় ফোন অতিরিক্ত গরম হলে দীর্ঘ সময় গেম খেলা বা ভারী অ্যাপ ব্যবহার এড়িয়ে চলা ভালো।
আর ফোনের ধাতব অংশে শিরশির অনুভূতি হলে সেটিকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রথমে চার্জার, কেবল ও বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অ্যাপলও ক্ষতিগ্রস্ত চার্জার-কেবল এবং আর্দ্র অবস্থায় চার্জ দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক শকের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে।
শেষ কথা
চার্জে দেওয়া ফোনে হাত দিলে হালকা শিরশির বা বৈদ্যুতিক ঝাঁকুনির মতো অনুভূতি হওয়ার পেছনে সামান্য লিকেজ কারেন্ট, ধাতব বডির সূক্ষ্ম কম্পন, স্ট্যাটিক বিদ্যুৎ কিংবা চার্জার ও বৈদ্যুতিক সংযোগের ত্রুটি থাকতে পারে। সব ক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক না হলেও কারণ নিশ্চিত না হয়ে নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষ করে নিম্নমানের চার্জার, ক্ষতিগ্রস্ত কেবল বা ত্রুটিপূর্ণ সকেট ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। সমস্যা বারবার হলে চার্জার ও ফোন পরীক্ষা করান। মনে রাখবেন, ফোনের সামান্য শিরশির অনুভূতিকে অবহেলা না করে সতর্ক হওয়াই নিরাপদ।







