২০২৫ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত বৃহৎ সংস্কার নেয়া হয়েছে, যেখানে অন্যতম প্রধান পরিবর্তন হলো ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবা কখনোই বন্ধ না করার উপায় আইনে স্থায়ীভাবে রাখা। এই বিধান ভবিষ্যতে প্রশাসনিক আদেশ বা অন্য কোনো কারণে ইন্টারনেট বা মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করার সুযোগ তুলে দেয় না। এই পরিবর্তনটি টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ (সংশোধন) ২০২৫-এর অংশ হিসাবে অনুমোদিত হয়েছে এবং এতে মানবাধিকার, তথ্য অধিকার ও ডিজিটাল স্বাধীনতা সংক্রান্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন-ব্যবহৃত মোবাইল ফোন যেভাবে ডি-রেজিস্ট্রেশন করবেন ২০২৬(আপডেট)
কেন এই পরিবর্তন করা হলো?
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও ডাক বিভাগ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পরামর্শ করে টেলিযোগাযোগ আইনের খসড়া সংস্করণ তৈরি করেছে। এতে ইন্টারনেট শাটডাউন বা বন্ধ করার ক্ষমতার provision জোরালোভাবে অপসারণ বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে কেউ—সরকার বা অন্য কেউ—বিচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করতে না পারে।
এর পিছনে মূল কারণগুলো হলো—
-
ডিজিটাল অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা।
-
ব্যবসা, শিক্ষা, ব্যাংকিং ও জরুরি সেবায় বিঘ্ন এড়ানো।
-
আইনের অপব্যবহার প্রতিরোধ করা।
-
আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আইনকে সামঞ্জস্য করা।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সংশোধন বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও মানবাধিকার-ভিত্তিক পরিবেশকে শক্তিশালী করবে।
আইনে কীভাবে ইন্টারনেট বন্ধ নিষিদ্ধ করা হলো?
সংভাব্য সংশোধন অনুযায়ী—
- ধারা 97-এ স্পষ্টভাবে অনুল্লিখিত হয়েছে—“কোনো পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ করা যাবে না”, অর্থাৎ ১ মিনিটের জন্যও বন্ধ রাখার ক্ষমতা নেই।এটি প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে করার কোনো সুযোগ নেই।
- একই সাথে, ইন্টারনেট শাটডাউন বা নেটওয়ার্ক ব্ল্যাকআউটকে আইনের বাইরে ফেলা হয়েছে, যাতে সাইবার নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে কোনভাবেই বাধাগ্রস্ত করা না যায়।
টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ (সংশোধন) ২০২৫-এর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন
এই ইন্টারনেট-বন্ধ নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও নতুন খসড়া সংশোধনে আরও কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে—
১) বিটিআরসি-র স্বায়ত্তশাসন ও দায়িত্ব
টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC)-র স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং লাইসেন্স প্রদান-সম্পর্কিত কর্তৃত্ব মানসম্মত গবেষণা ও প্রতিবেদন ভিত্তিক সিদ্ধান্তে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—এতে বিটিআরসি আরও কার্যকরভাবে খাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
২) নজরদারি ও তথ্য-গোপনীয়তা বিধান
নাগরিকদের ব্যক্তিগত ডেটা নিরাপত্তার জন্য সিম/ডিভাইস নিবন্ধন তথ্য অপব্যবহার করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে এবং বৈধ ইন্টারসেপশন শুধুমাত্র আদালতের অনুমোদনসহ পরিচালনার বিধান নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
৩) নজরদারি ও ট্র্যাকিং অগ্রাধিকার
ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (NTMC) বিলুপ্ত করে এর পরিবর্তে Centre for Information Support (CIS) নামে একটি আধা-বিচারিক সংস্থা গঠন করা হচ্ছে, যার কাজ ইন্টারসেপশন কার্যক্রমকে আইনি ও জবাবদিহিমূলক পর্যায়ে পরিচালনা করা।
৪) বিদ্যমান অপরাধ সংক্রান্ত সংশোধন
নতুন আইনে কিছু “speech offence” বা বাক স্বাধীনতা-সংক্রান্ত অপরাধকেও সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এখন শুধু সরাসরি সহিংসতার উদ্দেশ্যে উসকানি দেওয়া ফৌজদারি হিসেবে ধরা হবে, যাতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমাহীনভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়।
এই বদল কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?
আইনের এই পরিবর্তন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে কারণ—
- ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধের ফলে শিক্ষার্থীর ক্লাস, অনলাইন ব্যবসা ও ব্যাংকিং সেবা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা আর ঘটবে না
- নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হবে।
- আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশকে বিশ্বমানের নিয়ন্ত্রক পরিবেশ হিসেবে দৃঢ় করবে।
- সরকার ও প্রাইভেট সেক্টর উভয়ের জন্য পরিষেবা স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ডিজিটাল অধিকার-সমর্থক সংস্কারের অংশ।
ইন্টারনেট বন্ধ নিষেধাজ্ঞা কোথায় প্রযোজ্য?
এই বিধান দেশজুড়ে সব স্তরে প্রযোজ্য—
🔹 জাতীয় স্তরে পুরো দেশের ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা যাবে না।
🔹 স্থানীয় স্তরে কোনো জেলা বা থানা-ভিত্তিক বন্ধের আদেশও কার্যকর হবে না।
🔹 শিক্ষা, ব্যবসা, ব্যাংকিং, জরুরি সেবা বা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও পরিষেবা বাধিত হবে না।
এর ফলে আগামীতে কোনো কারণ বা পরিস্থিতিতেই ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা যাবে না এমন একটি আইনি বাধা তৈরি হয়েছে।
বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
যদিও সবার কাছে এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলা হচ্ছে, কিছু সংগঠন যেমন মানবাধিকার ও স্বাধীনতা-সমর্থক গোষ্ঠী মনে করেন আইনের অন্যান্য ব্যাখ্যা ও নজরদারি বিধানের কারণে ডেটা নিরাপত্তা ও নাগরিকের গোপনীয়তা বিষয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে। তারা চায় আরো স্বচ্ছ ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কাঠামো।
FAQ – (প্রশ্ন ও উত্তর)
প্রশ্ন ১: নতুন টেলিযোগাযোগ আইনে ইন্টারনেট বন্ধ করা কি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ?
উত্তর: হ্যাঁ, সংশোধিত খসড়া আইনে ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ পরিষেবা কোনো পরিস্থিতিতেই বন্ধ রাখা যাবে না বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন ২: এই পরিবর্তন কী ভিআইপি কলিং বা জরুরি সেবা বন্ধ করতে বাধা দেয়?
উত্তর: হ্যাঁ। পরিষেবা নিরাপত্তা ও জরুরি পরিষেবা নির্বিঘ্নে চলার জন্য কোনও অবাঞ্ছিত ইন্টারনেট ব্লক দেওয়া সম্ভব নয়।
প্রশ্ন ৩: আইনের আওতায় কোথায় নজরদারি হয়?
উত্তর: নজরদারি একমাত্র Centre for Information Support (CIS)-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে পরিচালিত হবে এবং তা আইন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ-নিয়ন্ত্রণ পাবেন।
প্রশ্ন ৪: সরকার কি আবার এই বিধান বাদ দিতে পারে?
উত্তর: বর্তমানে সংশোধিত আইনে এটি স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় অনুমোদিত কোনো পরিস্থিতিতেই প্রশাসনিকভাবে তা বাদ দেওয়া যাবে না।
প্রশ্ন ৫: এই পরিবর্তন বাংলাদেশে কবে অনুমোদিত হলো?
উত্তর: টেলিযোগাযোগ সংশোধনী অধ্যাদেশ ২০২৫-এর খসড়া অনুমোদন ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫-এ উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নিশ্চিত করা হয়।
উপসংহার
টেলিযোগাযোগ আইনের এই নতুন সংশোধনী একটি মাইলফলক, যেখানে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ বা জলদগ্ধ করার ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে আইনি বাধার মধ্যে ফেলা হয়েছে। এটি ডিজিটাল অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সার্বিক তথ্য অধিকার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি এটি নাগরিকদের ওপর নজরদারি, পরিষেবা মান উন্নয়ন, ও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-বাংলাদেশে প্রথম সরকারি MVNO সিম: সুবিধা, দাম ও কেনার নিয়ম
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔







